দীর্ঘদিন ধরে সঞ্চয় করে গড়ে তোলা অর্থ কোথায় নিরাপদে বিনিয়োগ করবেন—এমন প্রশ্নে মধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের মানুষের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরেই অনিশ্চয়তায় ছিলেন। বিভিন্ন আইনগত ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে অনেক সময় বৈধভাবে অর্জিত অর্থের একটি অংশ আনুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে থেকে যায় এবং নিরাপদ বিনিয়োগের সুযোগের অভাবে সেই মূলধন অলস অবস্থায় পড়ে থাকে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আবাসন খাতে, বিশেষ করে জমি ও প্লটে বিনিয়োগের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় সেই অলস মূলধন দেশের অর্থনীতির মূলধারায় যুক্ত হবে এবং একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে সাধারণ মানুষের আস্থা আরও শক্তিশালী হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আবাসন খাত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। নির্মাণসামগ্রী, প্রকৌশল, পরিবহন, আসবাবপত্রসহ দুই শতাধিক শিল্প ও সেবা খাত আবাসন ব্যবসার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) নির্মাণ খাতের অবদান প্রায় ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ। খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা বলছেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধি এবং উচ্চ নিবন্ধন খরচের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আবাসন বাজারে যে স্থবিরতা দেখা দিয়েছিল, নতুন এই বিনিয়োগের সুযোগ সেই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে সহায়ক হবে। জমি ও প্লটে বিনিয়োগ বাড়লে নতুন প্রকল্প গ্রহণের পাশাপাশি আবাসন শিল্পে কর্মসংস্থানও আরও বৃদ্ধি পাবে বলে তাদের প্রত্যাশা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকা অলস অর্থ জমি ও প্লট কেনাবেচার মাধ্যমে অর্থনীতিতে প্রবেশ করলে বাজারে তারল্য বৃদ্ধি পাবে। এতে বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের গতি বাড়বে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও সক্রিয় হবে। ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডের নির্বাহী মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ ফরহাদুজ্জামান বলেন, দেশের মানুষের উপার্জিত অর্থ দেশের ভেতরেই বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করা সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। তার মতে, এই অর্থ আবাসন খাতে বিনিয়োগ হলে তা শুধু স্থায়ী সম্পদে রূপান্তরিত হবে না, বরং নতুন আবাসন প্রকল্প, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং পরিকল্পিত নগরায়ণকে আরও ত্বরান্বিত করবে। একই সঙ্গে দেশীয় বিনিয়োগের সুযোগ বৃদ্ধি পাওয়ায় বিদেশে মূলধন চলে যাওয়ার প্রবণতাও কমবে।
বিশ্লেষকদের মতে, জমি ও প্লটের লেনদেন বৃদ্ধি পেলে সরকারের রাজস্ব আয়ও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে। বর্তমানে সম্পত্তি নিবন্ধনের মাধ্যমে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় করে থাকে। নতুন বিনিয়োগের সুযোগে লেনদেনের পরিমাণ বাড়লে নিবন্ধন ফি, স্ট্যাম্প শুল্ক এবং অন্যান্য কর বাবদ আয়ও বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া নির্ধারিত ফি পরিশোধের মাধ্যমে এই বিনিয়োগ সুবিধা গ্রহণের সুযোগ থাকায় জাতীয় কোষাগারে অতিরিক্ত রাজস্ব যুক্ত হবে। ফলে একদিকে অর্থনীতিতে তারল্য সংকট কমবে, অন্যদিকে সরকারের রাজস্বভিত্তিও আরও শক্তিশালী হবে।
রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সভাপতি ড. মো. আলী আফজাল বলেন, আবাসন মানুষের অন্যতম মৌলিক চাহিদা এবং দ্রুত নগরায়ণের ফলে দেশে মানসম্মত আবাসনের চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। শুধু রাজধানী ঢাকা নয়, বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতেও নতুন আবাসন প্রকল্পের বিস্তার ঘটছে। তিনি বলেন, অতীতে দেশের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মূলধন বিদেশের আবাসন খাতে বিনিয়োগ হয়েছে। সরকারের নতুন উদ্যোগ দেশীয় আবাসন শিল্পে বিনিয়োগকে উৎসাহিত করবে এবং বিদেশে মূলধন পাচারের ঝুঁকি কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের আবাসনের সুযোগ যেমন বাড়বে, তেমনি দেশের অর্থনীতিও আরও শক্তিশালী হবে।
খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, অর্থনীতির আনুষ্ঠানিক ধারায় অলস মূলধন ফিরিয়ে আনার এই উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও আবাসন খাতের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য আরও কিছু সংস্কার জরুরি। বিশেষ করে জমির নিবন্ধন ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে কমিয়ে আনা হলে লেনদেনের পরিমাণ আরও বাড়বে এবং ক্রেতাদের আগ্রহ বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া প্রথমবারের মতো জমি বা প্লট কিনতে আগ্রহীদের জন্য স্বল্প সুদে ঋণসুবিধা চালু করা গেলে আবাসন খাত নতুন গতি পাবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে আবাসন শিল্প শুধু বিনিয়োগের নিরাপদ ক্ষেত্রই নয়, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করবে।











