২৮শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বর্ষায় দেয়াল রক্ষায় বাড়ছে প্রযুক্তিনির্ভর রঙের চাহিদা

বর্ষা এলেই বাড়ি ও ভবনের দেয়ালে স্যাঁতসেঁতে ভাব, ছত্রাকের আক্রমণ, নোনা ধরা এবং রং উঠে যাওয়ার মতো নানা সমস্যা দেখা দেয়। অতিরিক্ত আর্দ্রতা শুধু দেয়ালের সৌন্দর্যই নষ্ট করে না, দীর্ঘদিন অবহেলা করলে ভবনের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ ও নির্মাণসামগ্রীর ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে বর্ষাকালে দেয়াল সুরক্ষায় শুধু পছন্দের রং বা শেড বেছে নেওয়ার পরিবর্তে দেয়ালের ধরন ও পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর পেইন্ট ব্যবহারের দিকে নজর দিচ্ছেন বাড়ির মালিকরা।

বর্তমানে বাজারে অ্যান্টিফাঙ্গাল, ওয়াটার রেজিস্ট্যান্ট, অ্যালকালি রেজিস্ট্যান্ট, ওয়েদারপ্রুফ এবং হিট-রিফ্লেকটিভ প্রযুক্তির বিভিন্ন ধরনের রং পাওয়া যাচ্ছে। পাশাপাশি ঘরের ভেতরের পরিবেশকে আরও উজ্জ্বল ও আরামদায়ক রাখতে অফ-হোয়াইট, ক্রিম, বেইজসহ হালকা শেডের জনপ্রিয়তাও বাড়ছে। বিশেষ করে বর্ষার মেঘলা আবহাওয়ায় ঘরে পর্যাপ্ত আলোর অনুভূতি তৈরি করতে সিল্ক, এগশেল বা অন্যান্য নরম ফিনিশের রঙের ব্যবহারও বাড়ছে।

দেয়ালের সুরক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার

বর্তমান সময়ে রঙের বাজারে শুধু সৌন্দর্য নয়, স্থায়িত্ব, স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং পরিবেশগত বিষয়কেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ক্রেতাদের চাহিদা ও আধুনিক আবাসন ব্যবস্থার প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে পেইন্ট নির্মাতারা বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর পণ্য বাজারে আনছেন।

অ্যান্টিফাঙ্গাল ও আর্দ্রতা প্রতিরোধী রং

বর্ষাকালে দেয়ালে অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে ছত্রাক ও ফাঙ্গাস জন্মানোর ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষ করে কম আলো-বাতাস চলাচল করে এমন ঘর, বাথরুমসংলগ্ন দেয়াল কিংবা স্যাঁতসেঁতে এলাকায় এ সমস্যা বেশি দেখা যায়। এসব ক্ষেত্রে অ্যান্টিফাঙ্গাল বৈশিষ্ট্যযুক্ত রং দেয়ালকে ছত্রাকের আক্রমণ থেকে তুলনামূলকভাবে বেশি সুরক্ষা দিতে পারে।

তবে শুধু রং করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না। দেয়ালে পানি চুইয়ে পড়া, পাইপলাইনের লিকেজ বা নির্মাণগত ত্রুটি থাকলে প্রথমে সেগুলো চিহ্নিত করে মেরামত করা জরুরি। এরপর উপযুক্ত প্রাইমার ও সঠিক ধরনের পেইন্ট ব্যবহার করলে দেয়ালের স্থায়িত্ব বাড়ানো সম্ভব।

লো ও জিরো ভিওসি পেইন্ট

ঘরের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ ও বাসিন্দাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বর্তমানে লো ভিওসি (Low VOC) ও জিরো ভিওসি (Zero VOC) পেইন্টের ব্যবহারও বাড়ছে। এসব রঙে উদ্বায়ী জৈব রাসায়নিকের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম থাকায় রং করার পর তীব্র গন্ধ কম হয় এবং ঘরের বাতাসে ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতিও কমানোর সুযোগ থাকে।

শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি কিংবা সংবেদনশীল পরিবেশের জন্য রং নির্বাচনের ক্ষেত্রে অনেক ক্রেতাই এখন এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিচ্ছেন। আধুনিক আবাসিক ভবনের পাশাপাশি স্কুল, হাসপাতাল, অফিস ও অন্যান্য ইনডোর স্পেসেও স্বাস্থ্যসম্মত পেইন্টের চাহিদা বাড়ছে।

তাপ প্রতিফলক বা কুলিং প্রযুক্তি

গরমের সময় ভবনের ভেতরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে তাপ-প্রতিফলক বা কুলিং প্রযুক্তির রঙের ব্যবহারও বাড়ছে। এ ধরনের পেইন্ট সূর্যের তাপের একটি অংশ প্রতিফলিত করতে সহায়তা করে, ফলে ভবনের বাইরের দেয়ালে তাপ শোষণের পরিমাণ কমতে পারে।

পণ্যের ধরন, ভবনের অবস্থান, নির্মাণ উপকরণ ও অন্যান্য পরিবেশগত বিষয়ের ওপর নির্ভর করে এ ধরনের প্রযুক্তি ঘরের তাপমাত্রা কয়েক ডিগ্রি পর্যন্ত কমাতে সহায়তা করতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। ফলে দীর্ঘমেয়াদে ভবনের আরামদায়ক পরিবেশ বজায় রাখার পাশাপাশি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ওপর চাপ কমানোর সম্ভাবনাও থাকে।

ওয়াশেবল ও দাগ-প্রতিরোধী পেইন্ট

শিশুদের ঘর, রান্নাঘর, ডাইনিং স্পেস কিংবা বেশি ব্যবহৃত জায়গার দেয়ালে দ্রুত দাগ পড়ে যাওয়ার প্রবণতা রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে ওয়াশেবল বা দাগ-প্রতিরোধী পেইন্ট ব্যবহার করলে দেয়ালের সাধারণ ময়লা ও দাগ তুলনামূলক সহজে পরিষ্কার করা যায়।

অন্যদিকে অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল বৈশিষ্ট্যযুক্ত কিছু পেইন্ট দেয়ালের পৃষ্ঠে নির্দিষ্ট ধরনের জীবাণুর বৃদ্ধি কমাতে সহায়তা করতে পারে। তবে এসব পেইন্ট কোনোভাবেই নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বা স্বাস্থ্যবিধির বিকল্প নয়—বরং অতিরিক্ত সুরক্ষা হিসেবে কাজ করে।

কোন ধরনের রঙের কত দাম

বাজারে পেইন্টের দাম নির্ভর করে ব্র্যান্ড, মান, শেড, প্যাক সাইজ, কভারেজ এবং ব্যবহৃত প্রযুক্তির ওপর। সাধারণভাবে ইকোনমি বা বেসিক ইন্টেরিয়র পেইন্টের দাম প্রতি লিটার প্রায় ২৫০ থেকে ৪০০ টাকা। মাঝারি মানের প্লাস্টিক বা অ্যাক্রিলিক ইমালশনের দাম প্রতি লিটার ৩৫০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।

অন্যদিকে প্রিমিয়াম ইন্টেরিয়র, ওয়াশেবল কিংবা সিল্ক ফিনিশ পেইন্টের দাম প্রতি লিটার প্রায় ৫৫০ থেকে ১ হাজার টাকা বা তারও বেশি হতে পারে। বাইরের দেয়ালের জন্য মাঝারি মানের এক্সটেরিয়র পেইন্টের দাম সাধারণত প্রতি লিটার ৪৫০ থেকে ৭৫০ টাকা পর্যন্ত। আর প্রিমিয়াম ওয়েদারপ্রুফ, হিট-রিফ্লেকটিভ বা বিশেষ প্রযুক্তির এক্সটেরিয়র পেইন্টের দাম প্রতি লিটার ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকা বা তার বেশি হতে পারে।

তবে শুধু প্রতি লিটারের দাম বিবেচনা না করে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ দেয়ালে রং করতে মোট কত পেইন্ট লাগবে এবং কত বছর পর্যন্ত তা কার্যকর থাকবে—সেটিও হিসাব করা প্রয়োজন। কারণ কম দামের রং বারবার করার প্রয়োজন হলে দীর্ঘমেয়াদে মোট ব্যয় বরং বেড়ে যেতে পারে।

বাজেট সীমিত হলে কীভাবে রং নির্বাচন করবেন

সীমিত বাজেটে বাড়ি রং করার ক্ষেত্রে শুধু ব্র্যান্ড, চকচকে ফিনিশ কিংবা কম দামকে অগ্রাধিকার না দিয়ে দেয়ালের প্রকৃত সমস্যা চিহ্নিত করাই গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে রেইনবো পেইন্টসের হেড অব বিজনেস এ এস এম ফয়সাল বলেন, বাজেট সীমিত হলে প্রথমেই দেয়ালের মূল সমস্যার সমাধান এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক প্রযুক্তির পেইন্ট নির্বাচন করা উচিত।

তিনি বলেন, শুধু কম দাম বা বাহ্যিক সৌন্দর্য বিবেচনা করে রং নির্বাচন করলে পরবর্তী সময়ে দেয়াল মেরামত ও পুনরায় রং করার খরচ বেড়ে যেতে পারে। দেয়ালে স্যাঁতসেঁতে ভাব, ফাটল বা পানি প্রবেশের সমস্যা থাকলে আগে সেগুলো মেরামত করে এরপর বিশ্বস্ত ও মাননিয়ন্ত্রিত ব্র্যান্ডের উপযুক্ত পেইন্ট ব্যবহার করা উচিত।

তার পরামর্শ অনুযায়ী, শোবার ঘরে লো-ভিওসি পেইন্ট, রান্নাঘর ও শিশুদের ঘরে ওয়াশেবল বা পরিষ্কারযোগ্য রং, স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে অ্যান্টিফাঙ্গাল বৈশিষ্ট্যের পেইন্ট এবং ভবনের বাইরের দেয়ালে ওয়েদারপ্রুফ বা আবহাওয়া-প্রতিরোধী রং বেছে নেওয়া যেতে পারে।

রঙের ক্ষেত্রে সৌন্দর্যের সঙ্গে গুরুত্ব পাচ্ছে স্বাস্থ্য

আবাসন খাতে ক্রেতাদের পছন্দ ও চাহিদায়ও পরিবর্তন এসেছে। আগে যেখানে দেয়ালের রং নির্বাচনে মূলত শেড ও সৌন্দর্যকে গুরুত্ব দেওয়া হতো, সেখানে এখন স্থায়িত্ব, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি এবং রক্ষণাবেক্ষণের সুবিধাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিশেষ করে শিশুদের উপস্থিতি রয়েছে এমন পরিবার, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং আধুনিক আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনে পরিবেশবান্ধব ও প্রযুক্তিনির্ভর পেইন্টের ব্যবহার বাড়ছে। একই সঙ্গে স্থপতি ও ইন্টেরিয়র ডিজাইনাররাও এখন ভবনের ব্যবহার, অবস্থান ও পরিবেশ বিবেচনা করে রং নির্বাচন করছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি ভবনের দেয়ালে রং করার আগে শুধু কোন শেডটি দেখতে সুন্দর লাগবে তা বিবেচনা করলেই হবে না। দেয়ালের আর্দ্রতা, ভবনের অবস্থান, সূর্যের আলো, বৃষ্টির সরাসরি প্রভাব, ঘরের ব্যবহার এবং বাসিন্দাদের প্রয়োজন—সবকিছু বিবেচনা করে সঠিক পেইন্ট নির্বাচন করা উচিত।

বর্ষাকালে দেয়ালের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে তাই রং করার আগে দেয়ালের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি, ফাটল মেরামত, পানি প্রবেশের উৎস বন্ধ করা এবং উপযুক্ত প্রাইমার ব্যবহারের বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে। সঠিক প্রস্তুতির সঙ্গে মানসম্মত ও প্রয়োজনভিত্তিক প্রযুক্তির রং ব্যবহার করা গেলে দেয়ালের সৌন্দর্য দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার পাশাপাশি ভবনের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

সম্পর্কিত খবর

সর্বাধিক পঠিত

আবাসন খাতকে পরিকল্পিত, টেকসই ও দুর্নীতিমুক্ত করতে কাজ করছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী

আবাসন খাতকে পরিকল্পিত, টেকসই ও দুর্নীতিমুক্ত করতে কাজ করছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী

দেশের আবাসন শিল্পকে জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ...