ঢাকা: নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াত নিশ্চিত করতে ঢাকায় চালু হয়েছে ১৪টি ‘পিংক বাস’। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা এবং সাম্প্রতিক পরিবহন-সংক্রান্ত তথ্য বলছে, শুধু নারী-নির্দিষ্ট বাস চালু করলেই গণপরিবহনে নারীদের নিরাপত্তা ও যাতায়াতের সমস্যার পূর্ণ সমাধান সম্ভব নয়।
ঢাকায় নারী যাত্রীদের জন্য আলাদা বাস চালুর উদ্যোগ নতুন নয়। ১৯৮০-এর দশকের শুরুতে চারটি রুটে পরীক্ষামূলকভাবে নারী-নির্দিষ্ট বাস চালু করেছিল বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি)। তবে কয়েক দিনের মধ্যেই সেই সেবা বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে ২০০৮ সালে আবার পাঁচটি বাস নিয়ে উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেটিও আর্থিকভাবে টেকসই হয়নি। ২০১৪ সালে ১৩টি রুটে ১৭টি বাস চালু করা হলেও সেবাটি মূলত সকাল ও বিকেলের ব্যস্ত সময়ে সীমাবদ্ধ ছিল।
বেসরকারি খাত থেকেও নারী যাত্রীদের জন্য আলাদা পরিবহন চালুর চেষ্টা হয়েছিল। ২০১৮ সালে র্যাংগস গ্রুপ ‘দোলনচাঁপা’ নামে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত নারী বাস চালু করে। বাসগুলোতে সিসিটিভি, প্রাথমিক চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ট্র্যাকিং সুবিধা রাখা হয়েছিল। তবে কয়েক বছরের মধ্যে সেটিও সীমিত হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত লাভজনক না হওয়ায় কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
বর্তমানে ঢাকায় প্রায় ৭,৫০০ বাস প্রায় ১০০টি রুটে চলাচল করছে। শহরের প্রয়োজনের তুলনায় এই সংখ্যা এখনও অপর্যাপ্ত। এমন পরিস্থিতিতে নারী যাত্রীদের জন্য আলাদা একটি ছোট বহর তৈরি করলে সামগ্রিক পরিবহন সক্ষমতা বাড়ার পরিবর্তে বিদ্যমান সক্ষমতা আরও ভাগ হয়ে যেতে পারে।
নারীদের জন্য নির্দিষ্ট বাস যদি দিনের কয়েক ঘণ্টা ছাড়া পর্যাপ্ত যাত্রী না পায়, তাহলে পরিচালন ব্যয়ও বেড়ে যায়। অতীতের নারী-নির্দিষ্ট বাস সেবাগুলোর ক্ষেত্রে কম যাত্রী, সীমিত সময়সূচি এবং পরিচালন ব্যয়ের কারণে আর্থিক ক্ষতির সমস্যা দেখা গেছে।
ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (DTCA) বিভিন্ন জরিপে নারীদের গণপরিবহন ব্যবহারের অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে। একটি যাত্রী জরিপে ১০,১২৩ জন বাসযাত্রীর মধ্যে ১,৩০৯ জন নারী ছিলেন। এছাড়া ৯৬২ জন কর্মজীবী নারীকে নিয়ে আলাদা অফিস-কমিউটার জরিপ পরিচালনা করা হয়। জরিপে অংশ নেওয়া নারীদের ৯৬ শতাংশের নিজস্ব কোনো ব্যক্তিগত যানবাহন ছিল না। ফলে তাদের জন্য নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জরিপে নারীদের সামগ্রিক বাসসেবা সন্তুষ্টির গড় স্কোর ছিল ৫-এর মধ্যে মাত্র ২.৩৫। নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও স্কোর ছিল ২.৩২। প্রায় ৬৫ শতাংশ নারী বাসসেবাকে অসন্তোষজনক বা অত্যন্ত অসন্তোষজনক হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। অর্থাৎ সমস্যা শুধু নিরাপত্তায় সীমাবদ্ধ নয়; স্বাচ্ছন্দ্য, নির্ভরযোগ্যতা, কর্মীদের আচরণ এবং বাসস্টপের অবস্থাসহ পরিবহনের বিভিন্ন ক্ষেত্রেই অসন্তোষ রয়েছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নারীরা গণপরিবহনে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন যাতায়াতের সময়, এরপর নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যকে। যাতায়াতের সময়ের গুরুত্বের স্কোর ছিল ৪.২৩, নিরাপত্তার ৪.১৫ এবং স্বাচ্ছন্দ্যের ৪.১২।
জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ৭০ শতাংশ নারী সিসিটিভি, জিপিএস ও অন্যান্য নিরাপত্তা সুবিধাসম্পন্ন একটি উন্নত পরিবহনসেবা ব্যবহার করতে আগ্রহী। তবে অতিরিক্ত ভাড়া দেওয়ার সক্ষমতা সীমিত। কর্মজীবী নারীদের মধ্যে ৬৪ শতাংশ মাসে ২,০০০ টাকার কম অতিরিক্ত ব্যয় করতে আগ্রহী ছিলেন।
অর্থাৎ নারীদের মধ্যে নিরাপদ ও উন্নত পরিবহনের চাহিদা স্পষ্ট। কিন্তু সেই সেবা যদি সাধারণ গণপরিবহনের তুলনায় অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়, তাহলে তার ব্যবহার ব্যাপকভাবে বাড়ানো কঠিন হতে পারে।
ঢাকার গণপরিবহনে নারীদের হয়রানির বিষয়টিও দীর্ঘদিনের। বিভিন্ন গবেষণায় গণপরিবহনে নারীদের হয়রানির উচ্চ হার উঠে এসেছে। ফলে নারীদের জন্য নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই।
তবে বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় যে বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে তা হলো—শুধু কয়েকটি রুটে সীমিত সংখ্যক নারী বাস চালু করে পুরো শহরের নারী যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব কি না।
নারী বাসের পাশাপাশি সাধারণ গণপরিবহন ব্যবস্থার নিরাপত্তা ও মান উন্নয়নও জরুরি। বিদ্যমান বাসে নারীদের জন্য নির্ধারিত আসন নিশ্চিত করা, বাসের সংখ্যা ও ফ্রিকোয়েন্সি বাড়ানো, যাত্রীদের অপেক্ষার সময় কমানো, সিসিটিভি ও পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা এবং কর্মীদের আচরণে জবাবদিহি নিশ্চিত করার মতো পদক্ষেপ আরও বেশি নারীকে সুবিধা দিতে পারে।
নারীদের জন্য বাস চালানো এবং নারী চালক ও নারী কন্ডাক্টরদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করাও ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থাকে নারীবান্ধব করতে হলে সীমিত কয়েকটি ‘পিংক বাসের’ পাশাপাশি পুরো গণপরিবহন নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা, নির্ভরযোগ্যতা ও সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।
১৪টি পিংক বাস এখন সড়কে রয়েছে। এই উদ্যোগ কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে বাসের সংখ্যা, রুট, নিয়মিত চলাচল এবং পরিচালন ব্যয়ের মতো পুরোনো সমস্যাগুলো কতটা কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা যায় তার ওপর। একই সঙ্গে নারী যাত্রীরা নিজেরাই যে বিষয়গুলোকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে জানিয়েছেন—নিরাপত্তা, স্বাচ্ছন্দ্য, নির্ভরযোগ্যতা ও কম অপেক্ষার সময়—সেগুলোকে কেন্দ্র করেই ভবিষ্যৎ পরিবহন পরিকল্পনা করা প্রয়োজন।
সূত্র: ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (DTCA) বাস রুট র্যাশনালাইজেশন প্রকল্পের জরিপ এবং সংশ্লিষ্ট গবেষণা।