৮ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

সমুদ্রসৈকতের কাছে পাহাড়ঘেরা ‘স্বপ্নচূড়া’, কক্সবাজারে কউকের প্রথম আবাসন প্রকল্প উদ্বোধন

সমুদ্রসৈকত থেকে মাত্র দেড় কিলোমিটার দূরে পাহাড় ও সবুজে ঘেরা মনোরম পরিবেশে গড়ে উঠেছে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) প্রথম আবাসন প্রকল্প ‘স্বপ্নচূড়া’। ১৫ তলা চারটি ভবনে মোট ৩৩৯টি ফ্ল্যাট নিয়ে নির্মিত প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছে। উদ্বোধনের পাশাপাশি ফ্ল্যাটের মালিকদের হাতে চাবিও হস্তান্তর করা হয়েছে।

কক্সবাজারের কলাতলী সমুদ্রসৈকতসংলগ্ন বাইপাস সড়কের আদর্শগ্রাম পাহাড় এলাকায় ‘আবাসিক ফ্ল্যাট উন্নয়ন প্রকল্প-১’ নামে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে কউক। শুক্রবার দুপুরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রকল্পটির উদ্বোধন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও কক্সবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কক্সবাজারকে একটি আধুনিক ও পরিকল্পিত পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। তবে উন্নয়নের নামে শহরকে কেবল বহুতল ভবনের কংক্রিটের জঙ্গলে পরিণত করা যাবে না। পরিবেশ ও প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রেখে পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।

তিনি বলেন, কক্সবাজারে পরিবেশবান্ধব কটেজ, রিসোর্ট, পার্ক ও বিনোদনকেন্দ্র গড়ে তোলার মাধ্যমে পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব। পরিকল্পিতভাবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে দেশি পর্যটনের পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকদেরও কক্সবাজারে আকৃষ্ট করা যাবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, কউকের ‘স্বপ্নচূড়া’ প্রকল্পের মাধ্যমে ৩৩৯টি পরিবার অপেক্ষাকৃত সুন্দর ও পরিবেশবান্ধব আবাসনের সুযোগ পেয়েছে। ভবিষ্যতে আবাসন সংকট মোকাবিলায় পরিবেশের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে আরও প্রকল্প নেওয়া হবে। পাশাপাশি কক্সবাজারের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য মাস্টারপ্ল্যানের কাজ দ্রুত শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

পাহাড়, সবুজ আর সমুদ্রের কাছাকাছি বসবাস

‘স্বপ্নচূড়া’ প্রকল্পের অন্যতম আকর্ষণ এর অবস্থান। ১৫ তলা ভবনের ছাদ কিংবা ব্যালকনি থেকে পশ্চিম দিকে তাকালে সমুদ্রসৈকতের দৃশ্য চোখে পড়ে। চারপাশে রয়েছে পাহাড় ও সবুজের সমারোহ। আবাসিক ভবনগুলো থেকে সমুদ্রের গর্জনও শোনা যায়।

প্রকল্পের বাসিন্দাদের অনেকে ইতোমধ্যে নতুন আবাসনে বসবাস শুরু করেছেন। তাঁদের মতে, কক্সবাজার শহরের ব্যস্ত ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বসবাসের তুলনায় স্বপ্নচূড়ার পরিবেশ অনেক বেশি স্বস্তিদায়ক।

ফ্ল্যাটের মালিক শাহেদুল ইসলাম বলেন, এত দিন শহরের ব্যস্ত এলাকায় বসবাস করতে হয়েছে। যানজট, শিশুদের স্কুলে যাতায়াতের সমস্যা এবং ছোট বাসায় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গাদাগাদি করে থাকার কারণে নানা ধরনের অসুবিধা ছিল। নতুন আবাসনে এসে সেই সমস্যাগুলো অনেকটাই কমেছে। পাশাপাশি সমুদ্রসৈকত কাছাকাছি হওয়ায় অবসর সময়ে সহজেই সেখানে যাওয়া সম্ভব।

আরেক বাসিন্দা কনক শর্মা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে শহরে তুলনামূলক বেশি ভাড়া দিয়ে বাসায় থাকতে হয়েছে। এর সঙ্গে ছিল পরিবেশগত নানা সমস্যা। কউকের এই প্রকল্পে তুলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্যে ফ্ল্যাট পাওয়ায় তাঁদের দীর্ঘদিনের নিরাপদ ও স্থায়ী আবাসনের প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে।

৬০ শতাংশের বেশি জায়গা উন্মুক্ত

কউক সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটিতে মোট ৩৩৯টি ফ্ল্যাট রয়েছে। প্রতি বর্গফুট ফ্ল্যাটের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩ হাজার ৮৯৫ টাকা। সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান বাজারদরের তুলনায় এই মূল্য তুলনামূলক সাশ্রয়ী।

প্রকল্পটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, পুরো জায়গার ৬০ শতাংশের বেশি অংশ উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। ফলে বহুতল ভবন হলেও প্রকল্প এলাকায় অতিরিক্ত ঘনবসতি তৈরি হয়নি। পর্যাপ্ত খোলা জায়গা ও সবুজ পরিবেশ রাখার মাধ্যমে বাসিন্দাদের জন্য তুলনামূলক স্বাস্থ্যকর আবাসিক পরিবেশ নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।

রয়েছে আধুনিক নিরাপত্তা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা

‘স্বপ্নচূড়া’ প্রকল্পে আধুনিক আবাসিক সুবিধার পাশাপাশি নিরাপত্তা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্জ্য অপসারণের জন্য গার্বেজ শুট বা পাইপের মাধ্যমে নির্দিষ্ট স্থানে বর্জ্য ফেলার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া অগ্নিনিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা, প্রশস্ত রিসেপশন এবং ভবনের ভেতরে চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা রাখা হয়েছে। প্রতিটি টাওয়ারে একাধিক সিঁড়ির পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত বের হয়ে যাওয়ার জন্য পৃথক নির্গমনব্যবস্থাও রয়েছে।

প্রকল্পের অধিকাংশ ফ্ল্যাট দক্ষিণ-পূর্বমুখী। আবাসন প্রকল্প থেকে সমুদ্রসৈকতে হেঁটে যেতে সময় লাগে আনুমানিক ১০ মিনিট। ফলে আবাসিক সুবিধার পাশাপাশি পর্যটনকেন্দ্রিক অবস্থানও প্রকল্পটির অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।

সাত বছরের ব্যবধানে বাস্তবায়ন

কউক সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে ‘আবাসিক ফ্ল্যাট উন্নয়ন প্রকল্প-১’ বা ‘স্বপ্নচূড়া’র নির্মাণকাজ শুরু হয়। দীর্ঘ কয়েক বছরের নির্মাণপ্রক্রিয়া শেষে ২০২৬ সালের জুনে প্রকল্পটির কাজ সম্পন্ন হয়।

প্রকল্পটি কক্সবাজারে পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব আবাসন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কউকের প্রথম বড় উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কর্তৃপক্ষের আশা, এর মাধ্যমে পর্যটন নগরীতে আবাসন ব্যবস্থাপনায় নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি হবে।

কউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য নিরাপদ ও পরিকল্পিত আবাসনের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যেই ভবিষ্যতে কক্সবাজারে আরও আবাসন প্রকল্প গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যারা ছিলেন

ফ্ল্যাট হস্তান্তর ও প্রকল্প উদ্বোধন উপলক্ষে শুক্রবার সকালে কউক ভবনের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। কউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ জসিম উদ্দিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী, শামীম আরা, আলমগীর মো. মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ, জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান, পুলিশ সুপার সাজেদুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

কর্তৃপক্ষ বলছে, কক্সবাজারের দ্রুত নগরায়ণের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভবিষ্যৎ আবাসন পরিকল্পনায় পরিবেশ সংরক্ষণ, উন্মুক্ত স্থান এবং নাগরিক সুবিধাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে পর্যটন নগরী কক্সবাজারকে আরও পরিকল্পিত, বাসযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব শহর হিসেবে গড়ে তোলার পথ সুগম হবে।

সম্পর্কিত খবর

সর্বাধিক পঠিত

আবাসন খাতকে পরিকল্পিত, টেকসই ও দুর্নীতিমুক্ত করতে কাজ করছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী

আবাসন খাতকে পরিকল্পিত, টেকসই ও দুর্নীতিমুক্ত করতে কাজ করছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী

দেশের আবাসন শিল্পকে জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ...