৩১শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

এক দশকের অন্যতম কঠিন সময় পার করছে আবাসন খাত

তাবাসসুম ইমাম

ভাইস প্রেসিডেন্ট, রিয়েল এস্টেট প্রফেশনালস ফোরাম

মানুষের মৌলিক চাহিদার অন্যতম হলো আবাসন। কিন্তু বর্তমানে দেশের আবাসন খাত দীর্ঘদিনের অন্যতম কঠিন সময় অতিক্রম করছে। প্লট, ফ্ল্যাট ও বাড়ি বিক্রিতে দীর্ঘদিন ধরে মন্দা অবস্থা বিরাজ করছে। নতুন বিনিয়োগ কমে গেছে উল্লেখযোগ্য হারে। অনেক প্রতিষ্ঠান পরিচালন ব্যয় মেটাতে লাভ ছাড়াই সম্পত্তি বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে, আবার অনেক কোম্পানি কর্মীদের বেতন-ভাতা নিয়মিত পরিশোধ করতেও হিমশিম খাচ্ছে।

বিশেষ করে ঢাকাকেন্দ্রিক মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের চাহিদা কমে যাওয়ায় অনেক ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের বিক্রি ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে। একই সঙ্গে নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

আবাসন উদ্যোক্তাদের মতে, এলসি খোলার জটিলতা এবং ডলারের উচ্চমূল্যের কারণে কাঁচামাল আমদানির ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ফলে শুধু ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান নয়, নির্মাণসামগ্রী উৎপাদন ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও বড় ধরনের চাপের মধ্যে রয়েছে। তারা মনে করেন, কম সুদে ঋণ, কর সুবিধা এবং সহজ অর্থায়নের সুযোগ প্রদান করা হলে খাতটি আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে।

গত কয়েক বছরে রড, সিমেন্ট, গ্লাস, কেবল, লিফটসহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রীর দাম ৩০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের ব্যয়ও অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। অনেক ছোট ও মাঝারি ডেভেলপার নতুন প্রকল্প গ্রহণে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আবাসন খাতের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৪০টিরও বেশি খাত সম্পৃক্ত রয়েছে। নির্মাণ শ্রমিক, প্রকৌশলী, স্থপতি, সিরামিক, রং, ফার্নিচার, ইলেকট্রিক্যাল পণ্য, স্টিল এবং ব্যাংকিং খাত—সবকিছুই কোনো না কোনোভাবে আবাসন শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লাখ মানুষের জীবিকা এই খাতের সঙ্গে জড়িত। ফলে আবাসন খাতের স্থবিরতা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

বর্তমানে মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য একটি ফ্ল্যাট কেনা আগের তুলনায় অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়েছে। কয়েক বছর আগেও তুলনামূলক কম সুদে দীর্ঘমেয়াদি হোম লোন পাওয়া যেত। কিন্তু বর্তমানে উচ্চ সুদের কারণে অনেক সম্ভাব্য ক্রেতাই নতুন বিনিয়োগ থেকে সরে আসছেন। পাশাপাশি জমির মূল্য বৃদ্ধি, অনুমোদন প্রক্রিয়ার জটিলতা, ইউটিলিটি সংযোগ ব্যয় এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক খরচ প্রকল্পের সামগ্রিক ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।

তবে সংকটের মাঝেও বাংলাদেশের আবাসন খাতের দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। দ্রুত নগরায়ণ, মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে, পূর্বাচল, উত্তরা, সাভারসহ বিভিন্ন অঞ্চলে পরিকল্পিত অবকাঠামো উন্নয়ন ভবিষ্যতের আবাসন বাজারকে আরও সম্প্রসারিত করবে। একই সঙ্গে নিরাপদ, আধুনিক ও কমিউনিটি-ভিত্তিক আবাসনের চাহিদাও ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আসন্ন জাতীয় বাজেটে আবাসন খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে মধ্যবিত্তের জন্য স্বল্প সুদের হোম লোন, প্রথমবারের ফ্ল্যাট ক্রেতাদের জন্য কর সুবিধা, নির্মাণসামগ্রীর ওপর শুল্ক ও ভ্যাট পুনর্বিবেচনা এবং রেজিস্ট্রেশন ব্যয় হ্রাসের উদ্যোগ বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে সুশাসন ও কমপ্লায়েন্স মেনে চলা ডেভেলপারদের জন্য সহজ অর্থায়ন ও নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।

রিয়েল এস্টেট শুধুমাত্র একটি ব্যবসা নয়; এটি মানুষের স্বপ্ন, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত একটি শিল্প। সরকার, ব্যাংকিং খাত এবং পেশাদার ডেভেলপারদের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এই শিল্পকে আরও টেকসই, আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব বলে আমি বিশ্বাস করি।

সম্পর্কিত খবর

সর্বাধিক পঠিত

রিহ্যাব নেতৃবৃন্দের সঙ্গে এমপি মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপুর সৌজন্য সাক্ষাৎ, আবাসন খাতের উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা
বসুন্ধরায় নেক্স রিয়েল এস্টেট-এর প্রিমিয়াম লাক্সারি আবাসন প্রকল্পে নতুন বিনিয়োগ ও লাইফস্টাইলের সুযোগ